আলসারের সমস্যা : জেনে নিন কিছু জরুরি বিষয়

সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত নাম পেপটিক আলসার। পেপটিক আলসার আসলে কী? পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত হাইড্রোক্লোরিক এসিড এবং পেপসিনের ক্রিয়ার ফলে পরিপাকতন্ত্রের কোনো স্থানে ক্ষত বা ঘা সৃষ্টি হলে তাকে পেপটিক আলসার বলে। পেপটিক কথাটি মূলত এসেছে পাকস্থলীর প্রোটিন পরিপাকে সাহায্যকারী এনজাইম ‘পেপসিন’ থেকে।




কোথায় কোথায় পেপটিক আলসার হয়
– ডিওডেনামের প্রথম অংশে
– পাকস্থলী যেখানে বাঁক নিয়েছে সেই ক্ষুদ্রতর অংশে
– খাদ্যনালীর নিচের অংশে
– অপারেশন করে ক্ষুদ্রান্ত্রের সাথে পাকস্থলীর সংযোগ ঘটালে সেই সংযোগস্থলে (জেজুনামে)।
– কালেভদ্রে মেকেলস ডাইভারটি ক্যুলামে।

পেপটিক আলসার সচরাচর বেশি হয় ডিওডেনাম ও পাকস্থলীতে। অতিরিক্ত এসিড নিঃসরণের জন্য ডিওডেনামে আলসার হয়। ডিওডেনাম হলো ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ। এখানে আগে থেকে অগ্ন্যাশয়ের ক্ষারীয় রস এসে থাকে, যা পাকস্থলী থেকে আগত এসিড মিশ্রিত খাদ্য থেকে ডিওডেনামকে রক্ষা করে। কিন্তু যদি ক্ষারীয় অগ্ন্যাশয়ে রস পর্যাপ্ত না আসে তাহলে অতিরিক্ত এসিডের জন্য ডিওডেনামে ঘা হতে পারে। একে বলে ডিওডেনাল আলসার। ওই দিকে, পাকস্থলী থেকে অতিরিক্ত হাইড্রোক্লোরিক এসিড নিঃসৃত হলে পাকস্থলীর ঝিল্লি আবরণী পর্দাটি নষ্ট হয়ে সেখানে ঘা হতে পারে। একে বলে গ্যাস্ট্রিক আলসার।
গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং ডিওডেনাল আলসার- এ দুটোকে একত্রে পেপটিক আলসার বলে।

পেপটিক আলসারের কারণ
পেপটিক আলসারের প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত অ্যাসিড নিঃসরণ এবং পাকস্থলীর ঝিল্লি আবরণী বা মিউকাস মেমব্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া। বিভিন্ন কারণে এটা হতে পারে। পেপটিক আলসার হওয়ার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো-

বংশগত
পেপটিক আলসারের রোগীদের ক্ষেত্রে বংশগত প্রভাব লক্ষ করা যায়। দেখা গেছে বাবা-মায়ের পেপটিক আলসার থাকলে তা সন্তান-সন্ততিরও হচ্ছে। এ ছাড়া দেখা গেছে যাদের রক্তের গ্রুপ ‘ও’ তারা বেশি ভোগেন ডিওডেনাল আলসারে।

অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া
ঠিকমতো খাবার চিবিয়ে না খেলে কিংবা অনিয়মিত খাবার খেলে পেপটিক আলসার হয়। আমাদের শরীর মূলত বায়োলজিক্যাল ঘড়ি। খাওয়া-দাওয়ার বেলায় সাধারণত আমরা একটা নিয়ম মেনে চলি। অর্থাৎ সকালে নাশতা, দুপুরে ভাত, বিকেলে নাশতা, আবার রাতে ভাত। এই খাদ্যাভ্যাস অনুসারে পাকস্থলীতে এসিড নিঃসৃত হয়। অর্থাৎ যে যেভাবে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলবেন তার এসিড নিঃসরণের ব্যাপারটা সেভাবে ঘটবে। যারা উপরি উক্ত অভ্যাসে অভ্যস্ত তারা যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান অর্থাৎ দুপুরের খাবার বিকেলে কিংবা রাতের খাবার নির্দিষ্ট সময়ে না খেয়ে আরো পরে খান, তাহলে এসিড নিঃসরণের ফলে দেখা দেবে জটিলতা। দেখা যায় পাকস্থলীর যে নিঃসরণ তা যথাসময়েই হচ্ছে কিন্তু ওই সময় পাকস্থলীতে খাবার না থাকার দরুন নিঃসৃত এসিড পাকস্থলীর দেয়ালকে পুড়িয়ে দেয়। এভাবেই সৃষ্টি হয় আলসার।

ধূমপান
ধূমপানের প্রভাবে পাকস্থলীর আবরণী ঝিল্লি নষ্ট হয় এবং এসিড নিঃসরণের মাত্রাও বেড়ে যায়। ফলে অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয় আলসার।

মসলাযুক্ত খাবার
অতিরিক্ত তেল, ঝাল এবং মসলাযুক্ত খাবার এসিড নিঃসরণের মাত্রা বাড়িয়ে পেপটিক আলসার তৈরিতে সাহায্য করে। বাসি খাবারও তাই।

চা, কফি কিংবা অ্যালকোহল পান
এসব পানীয় পেপটিক আলসারের অন্যতম কারণ। যারা চা, কপি কিংবা অ্যালকোহলে আসক্ত তাদের পেপটিক আলসার হবেই।

দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ
দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপে পাকস্থলীতে এসিড নিঃসরণ সর্বদা বেশি হয়। আর তাই পেপটিক আলসার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি থাকে।

ব্যথার ওষুধ
পেপটিক আলসারে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘ দিন ব্যথার ওষুধ খাওয়া। ব্যথার ওষুধ খালিপেটে খেলে কিংবা এই ওষুধের সাথে অ্যান্টাসিড বা রেনিটিডিন জাতীয় ওষুধ না খেলে পেপটিক আলসারে আক্রান্ত হতে হয়। এসব ব্যথার ওষুধের মধ্যে রয়েছে-
প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, ডাইক্লোফেনাফ সোডিয়াম, ইনডোমেথাসিন, ফেনাইল বিউটাজন, স্টেরয়েড প্রভৃতি।

হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরি
অন্ত্রের জীবাণু হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরির সংক্রমণে পেপটিক আলসার হয়। দেখা গেছে অনেক মানুষ অজ্ঞাতে এই জীবাণুটি বহন করে চলেছেন। আলসার রোধের প্রধান ওষুধগুলো আলসারের লক্ষণ বিলুপ্ত করলেও হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরি নামক ব্যাকটোরিয়াজনিত ক্ষতে সেখানে সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং পুনরায় আলসারের উৎপত্তি হয়।

রোগের উপসর্গ
পেপটিক আলসারের রোগীদের দীর্ঘকালব্যাপী ক্ষুধামন্দা থাকে। পেট ফাঁপা থাকতে পারে, বুক জ্বালাপোড়া, সেই সাথে টক ঢেঁকুর হতে পারে।
পেটে ব্যথা পেপটিক আলসারের প্রধান লক্ষণ। ব্যথা সাধারণত পেটের উপরিভাগে হয়। অনেক সময় চিনচিনে যন্ত্রণা হয়। ডিওডেনাল আলসারের রোগীদের ব্যথা হয় খালিপেটে, শেষ রাতের দিকে ব্যথা বেড়ে যায়- অনেক সময় ব্যথায় ঘুম ভেঙে যায়, তবে অ্যান্টাসিড কিংবা খাবার খেলে ব্যথা চলে যায়। কিন্তু গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীদের খাবার পর ব্যথা বেড়ে যায়, পেট জ্বলে যেতে থাকে।

গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীদের বমি হয় কিন্তু ডিওডেনাল আলসারের রোগীদের সাধারণত বমি হয় না- তবে দীর্ঘকাল ডিওডেনাল আলসারে ভুগলে বমি হয়, একপর্যায়ে পেটে এত অস্বস্তি হয় যে, মুখে আঙুল দিয়ে বমি করে রোগী স্বস্তি পেতে চায়। দীর্ঘস্থায়ী পেপটিক আলসারে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। এ সময়ে বমির সাথে রক্ত যেতে পারে, পায়খানা হতে পারে আলকাতরার মতো কালো। দীর্ঘস্থায়ী পেপটিক আলসারের রোগীর বমির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এদের বমির সাথে কয়েক দিন আগের জমা খাবার বেরিয়ে আসে।

গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীরা খাবার খেতে ভয় পায়, কারণ খাবার খেলে তাদের ব্যথা বেড়ে যায় কিন্তু ডিওডেনাল আলসারের রোগীদের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটে। এদের ক্ষুধা বেশি থাকে।
গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীদের শরীরের ওজন কমে যায়, কিন্তু ডিওডেনাল আলসারের রোগীদের শরীরের ওজন কমে না বরং বেশি বেশি খাদ্য গ্রহণের জন্য ওজন অনেক সময় বেড়ে যায়।

কিভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়

পরিপাক তন্ত্রের উপরিভাগের এনডোস্কপি
রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি এটা। এ ক্ষেত্রে একটি সরু নলের মাধ্যমে, পাকস্থলী ও ডিওডেনামের ভেতরের অবস্থা সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায়। পাকস্থলী ও ডিওডেনামের ঝিল্লির স্বাভাবিক বর্ণ লালচে ও মখমলের মতো। কিন্তু আলসার হলে সেখানটা ফ্যাকাসে ও সাদা হয়ে যায়।

বেরিয়াম মিল এক্স-রে
এ ক্ষেত্রে রোগীকে বেরিয়াম সালফেট খাওয়ানোর পর পাকস্থলী ও ডিওডেনামের এক্স-রে করা হয়। এক্স-রেতে আলসার থাকলে তা ধরা পড়ে, তবে অনেক সময় ধরা নাও পড়তে পারে।

এইচ পাইলোরি পরীক্ষা
হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরি, সংক্ষেপে এইচ পাইলোরি উপস্থিত থাকলে তা র‌্যাপিড ক্লো টেস্ট অথবা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে।

পেপটিক আলসারের রোগীর চিকিৎসা
পেপটিক আলসারের রোগীর চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাকে উপসর্গের হাত থেকে রেহাই দেয়া এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘা সেরে তোলা। পেপটিক আলসারের রোগীকে অবশ্যই রুটিনমাফিক শৃঙ্খলিত জীবনযাপন করতে হবে এবং ঠিকমতো ওষুধ খেতে হবে।

বিশ্রাম
ব্যথা বেড়ে গেলে রোগীকে বিছানায় পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে।

অ্যান্টাসিড থেরাপি
ব্যথা না কমা পর্যন্ত রোগীকে ২ ঘণ্টা অন্তর ১৫-৩০ মিলি তরল অ্যান্টাসিড খাওয়াতে হবে। ব্যথা কমে গেলে আহারের ১ ঘণ্টা পরে প্রতিবার ২ চা-চামচ এবং রাতে শোয়ার সময় ২ চা-চামচ দেয়া যেতে পারে। এভাবে ৪-৬ সপ্তাহ চলবে। তবে এরপরও পেটে ব্যথা কিংবা অস্বস্তি হলে অ্যান্টাসিড খেতে হবে।

আলসার উপসমকারী ওষুধ
৩০০ মি.গ্রা. রেনিটিডিন দিনে একবার অথবা ১৫০ মি.গ্রাম রেনিটিডিন দিনে দুইবার অথবা ৪০ মি.গ্রাম ফ্যামোটিডিন দিনে একবার অথবা ২০ মি.গ্রা. ফ্যামোটিডিন দিনে দুইবার অথবা ১ গ্রাম সুক্রালফেট দিনে চার বার নিয়মিতভাবে ১-২ মাস সেবন করলে শতকরা ৯০ ভাগ রোগী ভালো হয়। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে এসবের চেয়ে ‘ওমিপ্রাজল’ দ্রুত কাজ করে। এ ক্ষেত্রে ২০ মি. গ্রাম ওমিপ্রাজল দৈনিক একবার এক মাস খাওয়া যেতে পারে। ওমিপ্রাজলের মতো প্যানটোপ্রাজল, ইসোমেপ্রাজল বা র‌্যাবেপ্রাজল একই মাত্রায় খাওয়া যেতে পারে।

ট্রিপল থেরাপি
হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরিক জীবাণু উপস্থিত থাকলে তিনটে ওষুধ প্রয়োগ করে আলসারের চিকিৎসা করা হয়। একে ট্রিপল থেরাপি বলে। এই তিনটে ওষুধ হলো এমোক্সিসিলিন, মেট্রোনিডাজল ও বিসমাথ। তিনটে ওষুধই একমাত্র দুই সপ্তাহ খেতে হয়।
তবে বর্তমানে জনপ্রিয় ট্রিপল থেরাপি হলো একটি প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (ওমিপ্রাজল বা ইসোমোপ্রাজল) ও দু’টি অ্যান্টিবায়োটিক- ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন ও এমোক্সিসিলিন। এগুলো ওষুধ দৈনিক দুইবার সাত দিন গ্রহণ করতে হয়।
এর পরিবর্তে ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন, মেট্রোনিডাজল ও ল্যানসোপ্রাজলের কম্বিনেশন (পাইলোপ্যাক) গ্রহণ করতে পারেন। অথবা এমোক্সিসিলিন, ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন ও র‌্যাবে প্রাজলের কম্বিনেশন (পোইলো কিওর) গ্রহণ করা যেতে পারে। অথবা এমোক্সিসিলিন, ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন ও ল্যানসোপ্রাজলের কম্বিনেশন (পাইলোট্রিপ) গ্রহণ করতে পারেন।

প্রশান্তিদায়ক ওষুধ
দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, বিশ্রামহীনতা প্রভৃতিতে আলসার বেড়ে যায় বলে এ সময়ে দৈনিক রাতে ৫ মি. গ্রাম ডায়াজিপাম খাওয়া যেতে পারে।

উপদেশনামা
পেপটিক আলসারের রোগীকে অবশ্যই কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে, নইলে রোগ মুক্তি কিছুতেই ঘটবে না।
– ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করতে হবে।
– সময়মতো আহার করতে হবে।
– সাধারণ খাবার খেতে হবে। যেসব খাবার খেলে অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয় তা বাদ দিতে হবে।
– মসলাযুক্ত ও ঝাঁঝাল খাবার পরিহার করতে হবে।
– চা ও কফি এড়িয়ে চলতে হবে।
– মানসিক চাপ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা প্রভৃতি ঝেড়ে ফেলতে হবে।
– যেসব ওষুধ আলসার তৈরি করে তা পরিহার করতে হবে।

শল্যচিকিৎসা
যখন পেপটিক আলসারের রোগীর অপারেশন প্রয়োজন হয়
– যদি ওষুধের মাধ্যমে আলসার নিয়ন্ত্রণ করা না যায়
– যদি আলসারের কারণে রোগীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়
– যদি আলসারের কারণে বিভিন্ন জটিলতা (যেমন অন্ত্র ফুটো হওয়া, অন্ত্রে প্রবেশের দ্বার সরু হওয়া, রক্তক্ষরণ হওয়া) দেখা দেয়।
– যদি ক্যান্সার সন্দেহ করা হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।